Wednesday, February 4, 2026

৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চলে কেবল ১টি ট্রেন!

Must read

বিশেষ প্রতিনিধি :

খুলনা থেকে মোংলা বন্দরে রেলপথ বসাতে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। লক্ষ্য ছিল মোংলা বন্দরকে খুলনা ও বেনাপোল হয়ে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত করা, যাতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সহজ হয়। এজন্য বন্দরের ভেতর পর্যন্ত নতুন রেললাইন বসানো হয়। কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় এক বছর হতে চললেও ওই রুটে চলছে মাত্র একটি যাত্রীবাহী ট্রেন—‘মোংলা কমিউটার’। পণ্যবাহী ট্রেন চালুর কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে বিপুল অর্থ খরচের পরও প্রকল্পের উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। এ নিয়ে খুলনাবাসীর মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া খুলনা-মোংলা রেলপথ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লার্সেন অ্যান্ড টুবরো ও ইরকন ইন্টারন্যাশনাল। প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রুটে রয়েছে আটটি স্টেশন। প্রকল্পটি শেষ হয় ২০২৩ সালে। কিন্তু যাত্রীবাহী পুরোনো কোচ ও ইঞ্জিনে একটি মাত্র কমিউটার ট্রেন চালানো ছাড়া বন্দরকেন্দ্রিক কোনো বাণিজ্যিক সুফল আসেনি।
শুধু মোংলা রেলপথ নয়, রেলওয়ের বড় বড় প্রকল্পে একই চিত্র—সময় বাড়ছে, ব্যয় ফুলে-ফেঁপে উঠছে, কিন্তু কাজের অগ্রগতি ধীর।

কমলাপুর-জয়দেবপুর তৃতীয়-চতুর্থ লাইন প্রকল্প:
২০১৭ সালের শেষ দিকে ১,৩৯৪ কোটি টাকায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়। ২০২১ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চার দফায় সময় বাড়ানো হলেও অগ্রগতি মাত্র ৫৮%। আশ্চর্যের বিষয়—এত বিলম্বের পরও কোনো ক্ষতিপূরণ আদায় হয়নি।

দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প:
২০১৭ সালে শুরু হয়ে ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১২ বার সময় বাড়িয়ে নতুন সময়সীমা দাঁড়িয়েছে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর। কাজের অগ্রগতি এখনো মাত্র ৯০%। একই প্রকল্পের লট-২ অনুমোদন পেয়েছিল ২০১০ সালে। শেষ হওয়ার কথা ছিল তিন বছরের মধ্যে। কিন্তু ৯ বার সময় বাড়িয়ে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ—১,৮৫২ কোটি থেকে দাঁড়িয়েছে ১১,৩৩৬ কোটিতে।ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর এসডি-১ প্যাকেজ:
২০১২ সালে অনুমোদন পেয়ে ২০১৫ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় এখন নতুন সময়সীমা ২০২৭ সালের জুন। ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৪৯ কোটি থেকে প্রায় ৩,৩৪৩ কোটিতে।বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষের (বিপিপিএ) সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—রেলওয়ের পাঁচটি বড় প্রকল্পের ৪৩.৩৩ শতাংশ টেন্ডার সময়মতো শেষ হয়নি। কোথাও বিজ্ঞাপন প্রকাশের প্রমাণ নেই, কোথাও ব্যয় নির্ধারণ কমিটি গঠনের আদেশ নেই, আবার বাধ্যতামূলক চেকলিস্টও অনুপস্থিত। প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার ৩০টি টেন্ডারে গুরুতর নিয়ম লঙ্ঘন পাওয়া গেছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে টেন্ডার মূল্যায়ন করা হয়েছে, কিন্তু তাতেও কোনো দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হয়নি।বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রেলওয়ের প্রকল্পে বিলম্ব ও ব্যয়বৃদ্ধি শুধু সময় ও অর্থ অপচয় নয়—এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনায় গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রমাণ। তারা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবশালী, অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে প্রকল্প ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। কখনো কখনো খরচ ইউরোপের চেয়েও দ্বিগুণ হয়েছে।

তাদের মতে, অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে কঠোর নিয়ম প্রয়োগ, অভ্যন্তরীণ তদারকি ও ই-জিপি শতভাগ চালু করা ছাড়া রেলওয়ের প্রকল্পগুলোর অপচয় বন্ধ হবে না।আইএমইডি সচিব মো. কামাল উদ্দিন স্বীকার করেছেন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে অযৌক্তিক বিলম্ব হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে শতভাগ ই-জিপি চালুর মাধ্যমে ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার আশ্বাস দিয়েছেন।হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও রেলের সেবার মান চোখে পড়ার মতো বাড়েনি। যাত্রীসেবা যেমন সীমিত, তেমনি পণ্য পরিবহনেও কোনো উন্নয়ন হয়নি। ফলে প্রকল্পের সুফল না পেয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ বলছেন—“এভাবে জনগণের করের টাকা নষ্ট হলে উন্নয়ন নয়, অপচয়ই চলতে থাকবে।”

- Advertisement -spot_img

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

Latest article