বিশেষ প্রতিনিধি :
গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই বাংলাদেশ রেলওয়ের এক শ্রেণির কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান পাল্টাতে শুরু করেন। এমন এক আলোচিত নাম ফকির মো. মহিউদ্দীন, যিনি সরকার পরিবর্তনের পর রাতারাতি নিজেকে “রেলের বৈষম্যবিরোধী ফোরাম”-এর মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে পরিচিত করেন।
অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি চতুর্থ গ্রেড থেকে তৃতীয় গ্রেডে পদোন্নতি লাভ করেন এবং বর্তমানে রেলের মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) পদে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু এই পদোন্নতি ও নতুন দায়িত্বের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক।রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বিগত সরকারের সময় নিজেকে ‘বৈষম্যের শিকার’ দাবি করে মহিউদ্দীন বিভিন্ন মহলে লবিং শুরু করেন। সরকার পরিবর্তনের পর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি পদোন্নতি বাগিয়ে নেন।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে— এই পদোন্নতির পরই তার অনিয়ম ও দুর্নীতির মাত্রা বেড়ে যায়।
রেলের বিভিন্ন প্রকল্পে ‘ভ্যারিয়েশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে ফকির মো. মহিউদ্দীনের বিরুদ্ধে।
তিনি ঠিকাদার পরিবর্তন করে নিজেই কেনাকাটার ব্যবসা পরিচালনা করেছেন বলেও দাবি করেছেন রেলের একাধিক কর্মকর্তা।এছাড়া, অপ্রয়োজনীয় ওয়াশিং প্ল্যান্ট স্থাপন, অনুমোদনহীন এয়ার ব্রেক কেনার নামে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা আত্মসাৎ, এবং ঠিকাদারকে বিল প্রদান ছাড়াই মালপত্র সরবরাহ দেখিয়ে টাকা তোলার মতো অভিযোগও এসেছে তার বিরুদ্ধে।
এইসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যেই অনুসন্ধান শুরু করেছে।রেল ভবনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই ফকির মো. মহিউদ্দীন কিছু ছাত্র সমন্বয়ককে ভুল বুঝিয়ে রেল ভবনে শোডাউন করেন।
তবে এর আগে তিনি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন।
সে সময়ের প্রচারাভিযানের ছবি এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে।২০০১ সালের মে মাসে বাংলাদেশ রেলওয়ের সহকারী যন্ত্র-প্রকৌশলী পদে যোগ দেন ফকির মো. মহিউদ্দীন।
২৫ বছরের চাকরিজীবনের মধ্যে প্রায় ১২ বছর তিনি ছিলেন মেকানিক্যাল বিভাগের সবচেয়ে লাভজনক পদগুলোতে।
তার দায়িত্বে ছিলেন—
সৈয়দপুরের সহকারী কর্মব্যবস্থাপক (নির্মাণ), বিভাগীয় যন্ত্র প্রকৌশলী (লোকো),কর্মব্যবস্থাপক (নির্মাণ) পাহাড়তলী,বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (কারখানা) পাহাড়তলী,প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (উন্নয়ন),প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (পূর্ব) চট্টগ্রাম,যুগ্ম মহাপরিচালক (উন্নয়ন) — রেলভবনসহ একাধিক পদে।এইসব পদ থেকেই তিনি কেনাকাটা, দরপত্র, বাজেট নির্বাহ, বদলি ও পদায়নের প্রস্তাব দেওয়ার ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।রেলের ভেতরে এখন প্রশ্ন উঠেছে— “রেলের বৈষম্যবিরোধী ফোরাম” আসলে কারা পরিচালনা করছে এবং এর উদ্দেশ্য কী?
একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, এই ফোরাম মূলত ফকির মো. মহিউদ্দীনের অতীত অনিয়ম ঢাকতে তৈরি করা হয়েছে।এই বিতর্ক ঘিরে সাবেক রেল সচিব মাহবুব কবির মিলন তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন—
“শুনলাম রেলে নাকি বৈষম্য বিরোধী ফোরাম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মূখ্য ভূমিকায় আছে একজন সরকারি কর্মকর্তা। এর সংজ্ঞা, ভূমিকা, কার্যকারিতা, উদ্দেশ্য সম্পর্কে কারো ভাল জানা থাকলে, একটু জানাবেন তো প্লিজ।”
এই মন্তব্যের পর থেকেই রেল কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা আরও জোরদার হয়েছে।রেলওয়ে অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো দাবি করছে, এখন সময় এসেছে রেলের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক সংস্কার নিশ্চিত করার — নইলে ‘ফোরামের আড়ালে দুর্নীতির ফাঁদ’ থেকে মুক্তি মিলবে না।

