Wednesday, February 4, 2026

পিডি মাসউদুরের নোটে তিন হাজার কোটি টাকা ‘হরিলুট’

Must read

বৈদেশিক ঋণে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্প যমুনা রেলসেতু নির্মাণে সরকারি অর্থ ব্যয়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। রেলওয়ের অডিট শাখা, বৈদেশিক সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর (ফ্যাপাড) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক প্রতিবেদন এবং নথিতে প্রকল্পের ব্যয় ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার মাধ্যমে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব ব্যয়ের বড় অংশেই প্রকল্প পরিচালক ও রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রকৌশলীদের আপত্তি উপেক্ষা করে প্রকল্প পরিচালকের ‘ম্যাজিক নোটে’ উচ্চ দর নির্ধারণ এবং ভুয়া বিলের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের নানা অভিযোগ এখন খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

রেলওয়ের অডিট শাখা-২, বৈদেশিক সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর (ফ্যাপাড) ও দুদকের একাধিক প্রতিবেদন ও নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে যমুনা নদীর ওপর পৃথক ডাবল লাইনের একটি রেলসেতু নির্মাণ করা হয়েছে। চলতি বছরের ১৮ মার্চ নতুন সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানান অনিয়ম পর্যালোচনা করে শুধু অডিট আপত্তিতেই কমপক্ষে ৩ হাজার কোটির বেশি ব্যয় এখন প্রশ্নের মুখে। এই ব্যয়ের বড় অংশই প্রকল্প পরিচালক ও তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের অনুমোদিত সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট।ফ্যাপাডের ২০২০-২১ অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, মাত্র এক অর্থবছরেই বিভিন্ন খাতে প্রায় ৭০৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয় অডিট আপত্তির মুখে পড়েছে। আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিটেইল মেজারমেন্ট শিট, ড্রয়িং ও বিওকিউ ছাড়াই ১২৭ কোটি টাকার বেশি বিল পরিশোধ করা হয়েছে। যথাযথ সহায়ক ভাউচার ছাড়াই সিডি-ভ্যাট পরিশোধের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি টাকার বেশি। কাজে ব্যবহার না হওয়া স্টিল পাইপ শিট পাইলের বিপরীতে শুল্ক-ভ্যাট দিতে গিয়ে আরও সাড়ে ৫ কোটির বেশি সরকারি অর্থ আটকে গেছে প্রশ্নবিদ্ধ লেনদেনের কারণে। নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে কাজ শেষ হলেও ঠিকাদারের ওপর ‘ডিলে ড্যামেজ’ আরোপ না করায় সম্ভাব্য ক্ষতির অঙ্ক ধরা হয়েছে প্রায় ৯৯ কোটি টাকা। আলাদা একটি আপত্তিতে সিডি-ভ্যাটের নামে অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের পরিমাণ দেখানো হয়েছে প্রায় ১১ কোটি টাকা এবং ঠিকাদারের বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর না কেটে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির অঙ্ক এসেছে প্রায় ১৭ কোটি টাকার মতো।অডিট প্রতিবেদনে শুধু দেশি মুদ্রা নয়, জাপানি মুদ্রা ইয়েনেও বিপুল পরিমাণ লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মোবিলাইজেশন ও ডিমোবিলাইজেশন খাতে ইয়েন ৪ হাজার ১৫২ কোটি টাকার বেশি অঙ্ককে ‘বিশেষ পর্যবেক্ষণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ফ্যাপাড। সংস্থাটির মতে, প্রকল্পে সরকারি বিধি ও চুক্তির শর্ত প্রতিপালনে গুরুতর ঘাটতি রয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। পরবর্তী বছরগুলোতে অনিয়মের এই মাত্রা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বিশেষ ফিন্যান্সিয়াল ইন্সপেকশন (এসএফআই) প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিদেশি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে চুক্তিতে নির্ধারিত দেশ থেকে মালপত্র না এনেই ৪০৫ কোটি টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া কাস্টমস হাউসের পরিবর্তে অস্বাভাবিক পদ্ধতিতে সিডি-ভ্যাট আদায়ের নামে আরও ৪৩০ কোটি টাকার পেমেন্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে দর নির্ধারণ ও চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও। অডিট প্রতিবেদনের এক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্যাকেজে অস্বাভাবিক উচ্চ দর ধরে কাজ দেওয়ার ফলে সরকারকে অতিরিক্ত ১ হাজার ২২১ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। সাইট সুবিধা ও ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণে সরকারি সিডিউলের তুলনায় অতিরিক্ত ১১৩ কোটি টাকা এবং আন্তর্জাতিক বাজারদরের তুলনায় বেশি হারে মূল্য সমন্বয়ের কারণে আরও ২৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া কর-ভ্যাট-সংক্রান্ত আপত্তিগুলোর মধ্যে আছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিল থেকে আয়কর কম কাটা, যার পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ টাকার কাছাকাছি। ঠিকাদারের রিটেনশন বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর না কেটে আরও প্রায় ৩৪ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারানো এবং অফিস ভাড়া ও কনজ্যুমেবল খরচের আড়ালে ‘রিইমবার্সেবল বিল’ হিসেবে প্রায় সাড়ে ৩ কোটির অর্থ যথাযথ প্রমাণপত্র ছাড়া পরিশোধ করা হয়েছে। আবার মাটি পুনর্ব্যবহার না করে ফেলে দেওয়ার মতো দেখানো ছোট ছোট অনিয়মেও কয়েক কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব তুলে ধরেছে অডিট বিভাগ।অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরের ৭০৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকার গ্র্যান্ড টোটাল ছাড়াও পরের দুই-তিন অর্থবছরের বিশেষ অডিট ও এসএফআই আপত্তিতে আরও অন্তত ২ হাজার ৪০০ কোটির বেশি ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সব মিলিয়ে অনিয়ম, সন্দেহজনক লেনদেন ও সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কমপক্ষে ৩ হাজার কোটির ওপর দাঁড়ায়; ইয়েনে হিসাব করা অঙ্কগুলো টাকায় রূপান্তর করলে প্রকৃত অঙ্ক আরও বড় হবে।

এই বিপুল অঙ্কের অনিয়মের পেছনে প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে অডিট নথিতে একাধিকবার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রকল্পের ডব্লিউডি-১ ও ডব্লিউডি-২-সহ বড় বড় প্যাকেজের ফাইলগুলোতে মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীরা অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম দর প্রস্তাব করেছেন, কোথাও কাজের পরিমাপ নতুন করে যাচাই করার সুপারিশ দিয়েছেন, কোথাও কিছু কাজ গুছিয়ে নিলে ব্যয় কমানো সম্ভব—এমন মতামত লিখেছেন। কিন্তু একই ফাইলের এক পাশে আল ফাত্তাহর হাতে লেখা নোটে বারবার দেখা যায় ভিন্ন সুর। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত কাজ শেষ করা জরুরি; প্রস্তাবিত দর গ্রহণযোগ্য’—অর্থাৎ মাঠ পর্যায়ের আপত্তি সত্ত্বেও উচ্চ দর বজায় রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি। অন্য এক ফাইলে তার মন্তব্য, ‘দর কমালে কাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে, অতএব বিদ্যমান রেটেই চুক্তি করা যেতে পারে।’ এ ছাড়া আরেক জায়গায় ‘ঠিকাদারকে বারবার দর কমাতে বললে প্রজেক্টের অগ্রগতি ব্যাহত হবে’—এ যুক্তি দেখিয়ে তুলনামূলক বেশি দরে কাজ অনুমোদনের নির্দেশ দিয়েছেন।

অডিট নথিতে উল্লেখ আছে, এই ধরনের পর্যবেক্ষণ শুধু একটি-দুটি ফাইলে নয়, ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও তমা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের যৌথ কনসোর্টিয়ামের হাতে থাকা ডব্লিউডি-১, ডব্লিউডি-২ ও অন্য কয়েকটি বড় প্যাকেজের নথিতেই প্রায় নিয়মিত। অডিটরদের মন্তব্য—মাঠ পর্যায়ের প্রকৌশলীদের আপত্তি উপেক্ষা করেই প্রকল্প পরিচালক নির্দিষ্ট কনসোর্টিয়ামকে সুবিধাজনক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। কিছু আপত্তিতে সরাসরি বলা হয়েছে, নন-রেসপনসিভ বিডারকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘আঁতাতের সম্ভাবনা’ উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

দুদকের অনুসন্ধানেও একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। গত ৪ আগস্ট দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, যমুনা রেল সেতু প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারের শত শত কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রকল্পের মূল ও সংশোধিত ডিপিপি, সব ধাপের দরপত্র নথি, ঠিকাদারদের সঙ্গে চুক্তিপত্র, প্যাকেজভিত্তিক অনুমোদিত মূল্য তালিকা, বিল পরিশোধের ভাউচার, কাজের পরিমাপের খাতা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন এবং প্রকল্প অগ্রগতি-সংক্রান্ত সভার কার্যবিবরণীসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ নথি তলব করেছে দুদক। সেই চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বৈদেশিক সহায়তায় বাস্তবায়িত এ ধরনের বড় প্রকল্পে অনিয়ম প্রমাণিত হলে উন্নয়ন সহযোগী জাইকার সঙ্গে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অর্থায়ন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. ইমরান আকন বলেন, বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক তদন্ত চলমান রয়েছে। এটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে জানতে রেলের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আফজাল হোসেনকে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে এসএমএসের মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি। পরে প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমানকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি। গত ১৫ ডিসেম্বর দুপুরে রেল ভবনে তার কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। তার পিএস জানান, স্যার বাইরে আছেন, অপেক্ষা করেন। পরে আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তার দেখা মেলেনি।

সৌজন্যে :সাইদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম(কালবেলা)

- Advertisement -spot_img

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

Latest article