সেলিমুর রহমান :
বাংলাদেশ রেলওয়ের মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্ট এখন চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে দুইটি করে লোকোমোটিভ বিকল হওয়ার ঘটনায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। রেলনিউজের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চলতি বছরের ২৫ নভেম্বর থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র এক মাসে প্রায় ৬০টি ইঞ্জিন ফেল করেছে। গড় হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন অন্তত দুইটি ইঞ্জিন বিকল হয়েছে, যা রেলের সামগ্রিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরনো লক্কর-ঝক্কর ইঞ্জিন দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে দেশের জাতীয় রেলসেবা। দীর্ঘদিন ধরে নতুন লোকোমোটিভ সংযোজন না হওয়া, নিয়মিত মেইনটেন্যান্সের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত চাপের কারণে ইঞ্জিনগুলো চলতি পথেই বিকল হয়ে পড়ছে। এর ফলে কখনো সেকশনে, কখনো স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেন আটকে থাকছে। অনেক ক্ষেত্রে দূরবর্তী ডিপো থেকে রিলিফ ইঞ্জিন আনতে দেরি হওয়ায় যাত্রী ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
২৫ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক সপ্তাহেই সৈকত এক্সপ্রেস, তিতাস কমিউটার, ময়মনসিংহ মেইল, কালনী এক্সপ্রেস, রামসাগর মেইল ও বরেন্দ্র এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন ট্রেনের মোট ১২টি ইঞ্জিন বিকল হয়। কোথাও লুব অয়েল লিকেজ, কোথাও ট্রাকশন সমস্যায় ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। একাধিক ট্রেন এক থেকে দুই ঘণ্টার বেশি সময় সেকশনে আটকে থাকে।এর পরের সপ্তাহ, অর্থাৎ ২ ডিসেম্বর থেকে ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়। এই সময়ে মোট ১৪টি ইঞ্জিন ফেল করে। পাহাড়িকা এক্সপ্রেস একই সপ্তাহে একাধিকবার সমস্যায় পড়ে। একতা এক্সপ্রেস, মেঘনা এক্সপ্রেস, কর্ণফুলি কমিউটার, বলাকা কমিউটার, পদ্মরাগ কমিউটারসহ যাত্রী ও কমিউটার ট্রেনগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি ঢাকা স্টেশনে শান্টিং ইঞ্জিন অকার্যকর থাকায় রেক স্থাপন ব্যাহত হয়, যার প্রভাব পড়ে একাধিক ট্রেনের সময়সূচিতে।৮ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত আরেক দফা ১৪টি ইঞ্জিন বিকল হয়। এই সময়ে কয়েকটি গুরুতর ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে ট্রাকশন মোটরে আগুন লাগার ঘটনাও রয়েছে। উপবন এক্সপ্রেস, বিজয় এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস, দেওয়ানগঞ্জ কমিউটারসহ একাধিক ট্রেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলাচল বন্ধ রেখে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে ফেলে। রাজবাড়ী–কালুখালী সেকশনে ইঞ্জিনে আগুন লাগার ঘটনায় পুরো সেকশন দীর্ঘ সময় ব্লক হয়ে পড়ে এবং একাধিক ট্রেন বাতিল করতে হয়।সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক সপ্তাহে। এই সাত দিনে মোট ১৯টি ইঞ্জিন বিকল হয়। হাওর এক্সপ্রেস, ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস, মহানগর গোধুলি এক্সপ্রেস, ঢাকা মেইল, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, রংপুর এক্সপ্রেস, বেনাপোল এক্সপ্রেস ও উদয়ন এক্সপ্রেসসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর ট্রেনগুলো একের পর এক সমস্যায় পড়ে। কোথাও ট্রাকশন মোটরে আগুন, কোথাও হুইল স্লিপ, আবার কোথাও চলতি পথে সম্পূর্ণ ইঞ্জিন ফেলের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে ২১ ডিসেম্বর উদয়ন এক্সপ্রেস ও কালনী এক্সপ্রেসে একাধিকবার ইঞ্জিন পরিবর্তনের ঘটনায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।রেলওয়ের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর মতে, ইঞ্জিন বিকলের মূল কারণ হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত মেয়াদোত্তীর্ণ লোকোমোটিভ, নিয়মিত ও মানসম্মত মেইনটেন্যান্সের অভাব এবং প্রয়োজনের তুলনায় ইঞ্জিনের তীব্র সংকট। অনেক ইঞ্জিনের বয়স ৩০ থেকে ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে, যেগুলো দিয়ে এখনো ভারী আন্তঃনগর ট্রেন চালানো হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও পর্যাপ্ত যন্ত্রাংশের অভাবে অস্থায়ী মেরামতের ওপর নির্ভর করেই চলছে রেলওয়ের মেকানিক্যাল বিভাগ।এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে যাত্রীদের ওপর। দিনের পর দিন ট্রেন বিলম্ব, মাঝপথে ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকা এবং নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারার কারণে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। বিশেষ করে রাতে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইঞ্জিন ফেল হলে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের দুর্ভোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। অনেক যাত্রী বলছেন, ট্রেনে ওঠার পর এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা থাকে—কখন ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন রেলনিউজকে আরও বলেন, বর্তমান ইঞ্জিন সংকট সাময়িক হলেও বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ সচেতন ও সক্রিয় রয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা সমস্যাকে অস্বীকার করছি না। বাস্তবতা হলো—রেলওয়ের ইঞ্জিন সংকট রয়েছে, তবে সেটি সমাধানের জন্য একযোগে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ লোকোমোটিভগুলো ধাপে ধাপে সংস্কার ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি নতুন ইঞ্জিন সংযোজনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্টকে আরও শক্তিশালী করতে মেইনটেন্যান্স ব্যবস্থার উন্নয়ন, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং জনবল দক্ষতা বৃদ্ধির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।মহাপরিচালক বলেন, “ইঞ্জিন বিকলের হার কমিয়ে আনাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এজন্য ডিপো পর্যায়ে তদারকি বাড়ানো হয়েছে, রিলিফ ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে তুলনামূলক ভালো ইঞ্জিন সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা আশা করছি খুব শিগগিরই যাত্রীদের চোখে দৃশ্যমান উন্নতি আসবে। রেলওয়ের সেবা যেন নিরবচ্ছিন্ন থাকে, যাত্রী নিরাপত্তা ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত হয়—সে লক্ষ্যে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি।”এক মাসে প্রায় ৬০টি ইঞ্জিন ফেল হওয়ার এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি গভীর যান্ত্রিক সংকটের মুখোমুখি। দ্রুত নতুন লোকোমোটিভ সংযোজন, পুরনো ইঞ্জিন বাতিল, আধুনিক মেইনটেন্যান্স ব্যবস্থা চালু এবং কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ না করা হলে যাত্রী নিরাপত্তা ও জাতীয় রেলসেবা আরও বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ইঞ্জিন সংকট দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও মেয়াদোত্তীর্ণ লোকোমোটিভ ব্যবহারের ফল। তাঁদের মতে, অনেক ইঞ্জিন তাদের নির্ধারিত আয়ুষ্কাল পেরিয়ে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে চলাচল করায় ঘন ঘন বিকল হচ্ছে। নিয়মিত ও আধুনিক মেইনটেন্যান্স ব্যবস্থা না থাকায় ছোট ত্রুটিই বড় ফেইলিউরে রূপ নিচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন ইঞ্জিন সংযোজন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।

