মনিরুজ্জামান মনির:
২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ রেলওয়ে ও ব্র্যাক-এর মধ্যে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য রেলসেবার মান পর্যবেক্ষণ ও উন্নয়নে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি মানবিক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। কারণ একটি আধুনিক রাষ্ট্রের পরিবহনব্যবস্থা তখনই পূর্ণাঙ্গ হয়, যখন তা সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জন্য সমানভাবে প্রবেশগম্য হয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উদ্যোগ কি কেবল মানবিক অঙ্গীকার, নাকি ভবিষ্যতে আর্থিক ও প্রশাসনিক দায়ের নতুন অধ্যায়?
অন্তর্ভুক্তিমূলক রেলব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাঃ বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ গণপরিবহনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন। স্টেশনে ওঠানামা, টিকিট সংগ্রহ, প্ল্যাটফর্মে চলাচল কিংবা ট্রেনে প্রবেশ—সব ক্ষেত্রেই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে রেলস্টেশন ও ট্রেনের অবকাঠামো, প্রবেশগম্যতা, তথ্যপ্রদান ব্যবস্থা ও সহায়ক সেবার সমন্বিত মূল্যায়ন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। যদি এই মূল্যায়ন বাস্তবসম্মত সুপারিশ তৈরি করে এবং ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে রেলওয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের দিকে এগোতে পারবে। এতে কেবল বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রী নয়, বয়স্ক নাগরিক, অসুস্থ ব্যক্তি ও শিশুদের জন্যও ভ্রমণ সহজতর হবে।
রেলওয়ের প্রাপ্ত সম্ভাব্য সুবিধাঃ
১. নীতিগত আধুনিকায়ন
সেবার মান উন্নয়নের মাধ্যমে রেলওয়ে একটি আধুনিক ও মানবিক প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি অর্জন করতে পারে।
২. আইনি ঝুঁকি হ্রাস
প্রতিবন্ধী অধিকার ও সমঅধিকার সংক্রান্ত আইন রয়েছে। সেবার উন্নয়ন ভবিষ্যতে বৈষম্যসংক্রান্ত অভিযোগ বা আইনি জটিলতা কমাতে সহায়ক হবে।
৩. আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা
অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবহন ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৪. সামাজিক আস্থা বৃদ্ধি
বর্তমানে রেলওয়ে নানা অনিয়ম, সেবার ঘাটতি ও আর্থিক সংকটের সমালোচনার মুখে রয়েছে। এমন উদ্যোগ জনআস্থার পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে।
সম্ভাব্য ব্যয়ের প্রশ্ন
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর নিজেই বড় ব্যয়সাপেক্ষ নয়। তবে বাস্তবায়ন পর্যায়ে ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সম্ভাব্য ব্যয় ক্ষেত্রগুলো হতে পারে: র্যাম্প নির্মাণ,বিশেষ টয়লেট স্থাপন,ব্রেইল সাইনেজ
অডিও-ভিজ্যুয়াল ঘোষণা ব্যবস্থা,কর্মীদের প্রশিক্ষণ।
এগুলো বাস্তবায়ন করতে গেলে বড় স্টেশনগুলোতে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। যদি সারা দেশে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো— এই ব্যয় কি বিদ্যমান উন্নয়ন বাজেট থেকে আসবে? নাকি আলাদা প্রকল্প গ্রহণ করা হবে? যদি প্রকল্প নেওয়া হয়, তাহলে তা কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হবে?
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রয়োজনঃ রেলওয়ের সাম্প্রতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক উন্নয়ন প্রকল্পই ব্যয়ের তুলনায় কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। টেন্ডার প্রক্রিয়া, উপকরণ ক্রয়, পরামর্শক নিয়োগ—এসব ক্ষেত্র অতীতে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
অতএব, এই উদ্যোগ সফল করতে হলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি- সমঝোতা স্মারকের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশ, ব্যয় কাঠামো স্বচ্ছভাবে নির্ধারণ, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, স্বাধীন মনিটরিং ব্যবস্থা, অন্যথায় মানবিক উদ্যোগও কখনো কখনো “নতুন ব্যয়ের খাত” হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সহজপ্রাপ্য রেলভ্রমণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এ উদ্যোগকে তাই ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতেই হবে। তবে একইসঙ্গে মনে রাখতে হবে—রেলওয়ে ইতোমধ্যে আর্থিক চাপ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় জর্জরিত। সুতরাং নতুন কোনো কর্মসূচি গ্রহণের আগে আর্থিক সক্ষমতা, অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং জবাবদিহির কাঠামো নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অন্তর্ভুক্তিমূলক রেলব্যবস্থা হোক মানবিক অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন কোনোভাবেই যেন তা অনিয়মের নতুন দুয়ারে পরিণত না হয়।

