Sunday, February 15, 2026

উন্নয়ন না অপচয়? মেট্রোরেল নির্মাণে বিশ্ব রেকর্ড খরচ

Must read

সেলিমুর রহমান :

ঢাকার দুইটি নতুন মেট্রোরেল প্রকল্প—এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নিয়ে নির্মাণ ব্যয় নিয়ে ক্রমাগত উদ্বেগ বাড়ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানিয়েছে, এই দুই প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।

এই হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে খরচ হচ্ছে গড়ে ৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যেখানে উত্তরা-কামালাপুর মেট্রোরেল (এমআরটি-৬) প্রকল্পে খরচ হয়েছিল আনুমানিক ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা প্রতি কিমিতে।

আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের ব্যয় বহুগুণ বেশি
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিমি খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ভারতের পাটনায় প্রতি কিমিতে খরচ মাত্র ৪৫০ কোটি টাকা, থাইল্যান্ডের ব্যাংককে তা ৭৪০ কোটি, এমনকি উন্নত দেশ অস্ট্রেলিয়াতেও খরচ বাংলাদেশ থেকে কম।

পরামর্শকের খরচেও দেখা যাচ্ছে মারাত্মক অসামঞ্জস্য। ব্যাঙ্গালুরু মেট্রোতে যেখানে পরামর্শ ফি ছিল ২০৯ কোটি টাকা, সেখানে এমআরটি লাইন-১ এর ক্ষেত্রে তা দাঁড়িয়েছে ১,৩৭৪ কোটি টাকায়।
প্রকল্প ব্যয়ের বিশ্লেষণ
এমআরটি লাইন-১:
আন্ডারগ্রাউন্ড অংশের তিনটি দরপত্রে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। প্রতি কিমিতে গড়ে খরচ হচ্ছে ২,৩৭৪ কোটি টাকা। পুরো প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ, বেতন ও করসহ মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৯৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।

এমআরটি লাইন-৫:
মাত্র ৫.৫ কিমি আন্ডারগ্রাউন্ড অংশ নির্মাণের প্রস্তাবে জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাইসেই কর্পোরেশন চেয়েছে ১৫,৫২৭ কোটি টাকা—প্রতি কিমিতে প্রায় ২,৮২৮ কোটি টাকা। অথচ ২০১৯ সালের বাজেট ছিল মাত্র ৩,৯৬৮ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান ব্যয় বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে প্রকল্প দুটির সম্মিলিত খরচ এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

মূল কারণ: প্রতিযোগিতাহীন দরপত্র ব্যবস্থা
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প ব্যয়ের প্রধান কারণ হলো প্রতিযোগিতার অভাব। অর্থায়নকারী সংস্থা জাপানি জাইকা এমন শর্ত দিয়েছে, যাতে কেবলমাত্র জাপানি কোম্পানিগুলোই দরপত্রে অংশ নিতে পারে। দরপত্রের টেকনিক্যাল শর্তগুলোও এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা অন্য দেশের প্রযুক্তির পক্ষে মেনে চলা কঠিন।

ডিএমটিসিএল-এর এক কর্মকর্তা জানান, প্রাক-যোগ্যতা পেলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র দুটি জাপানি কোম্পানি দরপত্র জমা দেয়, যার ফলে তারা নিজেদের মতো করে মূল্য নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে।

হোয়াইট এলিফ্যান্ট” হতে পারে প্রকল্প
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক এই প্রকল্পকে “ওভারভ্যালুড” হিসেবে অভিহিত করে বলেন, প্রতি কিমিতে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় বিশ্বে নজিরবিহীন। তার মতে, এটি ভবিষ্যতে সরকারের জন্য বড় ভর্তুকির বোঝা হয়ে দাঁড়াবে এবং দেশের অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে।

তিনি আরও সতর্ক করেন, প্রযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদে জাপানের উপর নির্ভরশীলতা প্রকল্প ব্যয় আরও বাড়াবে। এ ধরনের ব্যয়ে টিকতে হলে টিকিট মূল্যও বাড়াতে হবে, যা সাধারণ নাগরিকদের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।

- Advertisement -spot_img

More articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -spot_img

Latest article